মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ভয়, আতঙ্ক বা উদ্বেগের মুখোমুখি হয়। কখনো একাকিত্বে, কখনো অন্ধকারে, আবার কখনো অজানা আশঙ্কায় ভয় আমাদের ঘিরে ধরে। ইসলামে এ ধরনের ভয় বা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকার জন্য রয়েছে দিকনির্দেশনা ও দোয়া।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের এমন এক দোয়া শিখিয়েছিলেন, যা ভীতি, উদ্বেগ বা দুঃস্বপ্নের সময় পড়লে মানুষ আল্লাহর নিরাপত্তায় আশ্রয় পেতে পারে।

🕋 ভয় দূর করার সেই দোয়া
আরবি দোয়া:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ، وَشَرِّ عِبَادِهِ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّياطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ:
“আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত্তাম্মাতি মিন গাদাবিহি ওয়া ইকাবিহি ওয়া শাররি ইবাদিহি ওয়ামিন হামাযাতিশশায়াতিন ওয়া আন ইয়াহদুরুন।”
অর্থ:
“আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে আশ্রয় চাই—
তাঁর ক্রোধ থেকে,
তাঁর শাস্তি থেকে,
তাঁর বান্দাদের অনিষ্টতা থেকে,
শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে
এবং তাদের উপস্থিতি থেকে।”
📖 হাদিসের সূত্র
এই দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে হাদিসগ্রন্থ আবু দাউদ (হাদিস : ৩৮৯৩) ও তিরমিজি (হাদিস : ৩৫২৮)-এ।
আমর ইবনু শু’আইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে—
“রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের ভীতিকর পরিস্থিতিতে এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দিতেন।”
অর্থাৎ, ভয় বা আতঙ্কের সময়, এমনকি ঘুমের মধ্যে ভয় পেলে কিংবা অশুভ কিছুর আশঙ্কা করলে, রাসুল (সা.) এই দোয়া পড়তে বলেছেন।
🌙 কখন পড়বেন এই দোয়া
ইসলামি শিক্ষায় এই দোয়া পড়ার সময় বা উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে না। তবে হাদিস ও ইসলামী ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়—
নিম্নোক্ত অবস্থায় দোয়াটি পড়া অত্যন্ত উপকারী:
- ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলে।
- অন্ধকারে ভয় পেলে বা উদ্বেগ অনুভব করলে।
- একা অবস্থায় শয়তানের কুমন্ত্রণা মনে এলে।
- ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে।
- অসুস্থতা বা মানসিক অস্থিরতায় ভুগলে।
✨ দোয়ার তাৎপর্য
এই দোয়ার প্রতিটি শব্দে রয়েছে গভীর অর্থ ও আধ্যাত্মিক শক্তি।
এখানে ‘কালিমাতিল্লাহিত্তাম্মাতি’ বলতে বোঝানো হয়েছে আল্লাহর সেই পরিপূর্ণ বাক্যসমূহ, যার কোনো ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা নেই।
‘গাদাবিহি ওয়া ইকাবিহি’—অর্থাৎ আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে রক্ষা চাওয়া।
‘শাররি ইবাদিহি’—মানুষের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
আর ‘হামাযাতিশশায়াতিন ওয়া আন ইয়াহদুরুন’—অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা ও উপস্থিতি থেকে মুক্তি কামনা করা।
এর মাধ্যমে মানুষ একাধারে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়।
💭 আধুনিক জীবনে প্রাসঙ্গিকতা
আজকের যুগে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও ভয় অনেক বেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে মানুষ প্রায়ই একাকিত্ব, আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তায় ভোগে।
মনোবিজ্ঞানীরাও বলেন, ভয় দূর করতে সবচেয়ে কার্যকর হলো ইতিবাচক চিন্তা ও মানসিক প্রশান্তি। ইসলামের দৃষ্টিতে দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে মানুষ সেই প্রশান্তি পেতে পারে।
এই দোয়াটি কেবল ভয় দূর করার জন্য নয়—এটি এক ধরনের আল্লাহর সঙ্গে আত্মিক সংযোগের মাধ্যম। এটি মনে করিয়ে দেয়, কোনো বিপদেই মানুষ একা নয়; সর্বশক্তিমান আল্লাহ সর্বদা তাঁর বান্দার পাশে আছেন।
🌿 রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা: আশ্রয় চাওয়ার শক্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শিখিয়েছেন।
ভয় বা বিপদের সময় তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন, দোয়া করতেন, এবং তাঁর সাহাবিদেরও তাই করতে উৎসাহিত করতেন।
তিনি বলেছেন—
“যে ব্যক্তি ভয় পেলে এই দোয়া পড়ে, আল্লাহ তাকে নিরাপত্তা দান করেন।”
(তিরমিজি, হাদিস : ৩৫২৮)
এই দোয়া তাই শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়, হৃদয়ে ধারণ করার মতো এক আধ্যাত্মিক অস্ত্র।
☪️ উপসংহার
ভয়, আতঙ্ক বা অনিশ্চয়তার মুহূর্তে মানুষ সবচেয়ে বেশি চায় শান্তি ও সুরক্ষা। ইসলামের শিক্ষা হলো—সেই শান্তি একমাত্র আল্লাহর কাছেই পাওয়া যায়।
রাসুল (সা.)-এর শেখানো এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়,
“আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্যের আশ্রয়ে থাকলে কোনো ভয় আমাদের কাবু করতে পারে না।”
সূত্র:
- সহিহ আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৯৩
- তিরমিজি, হাদিস : ৩৫২৮
